শুক্রবার, ২০ জুন, ২০১৪






এই জগতবাড়ি বড়ো পরম এক বসত আমাদের। যেখানে যখন-তখন বসে দুদন্ড ছায়াচ্ছন্নতায় কত কি কাজে ও অকাজে কত ভাবনাতুর ভাবসাব জাগায় আমাদের হৃদয়। মন তখন খানিক জিরিয়ে নেয় চিলতে জানলাতলায়। আলোমেঘের খেলায় ভেসে ভাসায় অবকাশের আদিম ডানাময় ভাবনাগুলি। কেউকেউ তারেই হয়তো কবিতা করে লিখতে বসে একান্ত অবেলাবিদ্ধ খেরোখাতায়। শিল্পীমন আঁকতে চায় তারেই রঙবেরঙের তুলির আঁচড়ে-আঁচড়ে। ছবি তোলার শখে ক্যামেরাবন্দী করে রাখতে চায় তারেই ছবি তোলে যে সেই ক্যামেরাম্যান নামের মানুষ। আর যাদের মাথার উপর ন্যূনতম ছাউনি নেই সেসব হতভাগ্য ঘরহীনের উলঙ্গ আকাশতলে ছেঁড়া কাঁথায় মুড়ি দিয়েই স্বপ্ন দেখার চেষ্টায় নির্ঘুম এক জগতবাড়ি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা - এইতো বড়ো সাধের একমাত্র জীবন। সে ফুরোয় দেখতে দেখতেই যেন বা চোখের নিমিষে। ছোট্ট একটা মাত্র জীবন। সারিসারি চলে যাওয়া খসে পড়ার মায়াময় বন্ধন। কোনও কিছুতে তারে তেমন বেঁধে রাখার শত চেষ্টাই বৃথা। যাবার সময় যখন আসে তখন সকল হিসেব নিকেষের সাধের খেরোখাতাটি ফেলেই যেতে হয় যে অমোঘ নিয়মে। জীবনের অপর নামটি আদতে মৃত্যু বলেই অর্বাচীনের ধারণা। কারও বাপের সাধ্যি নেই যে মৃত্যুরে ঠেকায়। আজকের দারুণ তাক লাগানো শত অত্যাধুনিকতা শত অন্তর্জালের আবাহনে যতই বিজ্ঞানের যান্ত্রিক চোখ ধাঁধানো অগ্রগতির জোয়ারে ভাসা জগতবাসি ভাসুক না মৃত্যুর ডাক এড়ানো বিষয়ক কোনও যাদুমন্ত্র যন্ত্রের নেই। তাইতো জীবনের অন্তিম পরিণতি অচিনপুর নামের ঠিকানা। মৃত্যু নামের অন্য জীবন সেইখানে নতুন করে সূচনা হয় কি হয়না কেউ জানেনা। তাই হয়তো - "যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ" - অর্থাৎ হৃদস্পন্দনের ধুকপুকানি যতক্ষণ ততক্ষণই আশালতা জড়িয়ে বেঁচে থাকার কত না উপকরণ ! কত যত্নের ছাত - ছাতের পরিচর্যা - টবের গাছগাছালি - বাগান। এক টুকরো ছায়াময়-মায়াময় বসতি রচনা করতে এক একটা মানুষের জীবনভর সাধ ও সাধনাবিদ্ধ যুদ্ধক্ষেত্র বলাই যায় জগত বাড়িটাকে। দুনিয়াদারী বলেও নামকরণ করা হয়েছে জগতবাড়িকে। এইখানে শতেক সুখেদুখে জীবন সংগ্রামে জীবন যায় শতেক উত্থান-পতনে। অবশেষে মৃত্যুর হাত ধরেই শেষযাত্রাকালে সমস্ত ফেলে অচিনপুরে। সেথায় ক্যামন মেঘচ্ছায়ারৌদ্রজলঝড় কে জানে !

    এই জীবন এই জগতবাড়ি নিয়ে অর্বাচীনের ভাবনাজাত পঙক্তিঘোর আসে মাঝেমাঝেই। তার কিছু বা লিখি কিছু বা অলিখিত আজও শাদা খেরোখাতার পাতায় লিখিত হবে বলেই। আজকাল যদিও কেউ তেমন খেরোখাতায় লিখেনা। এখনতো যন্ত্রনির্ভর সমগ্র জগত। অন্তর্জালে সমস্ত জগত হাতের মুঠোয় মুহূর্তে। এই মুহূর্তে আমিও ক্যামন খেরোখাতা রেখেই অন্তর্জালের দুনিয়াদারী উপভোগ করতে কীবোর্ডে আঙুল রেখে লিখছি ! এ যদি না অন্তর্জালের ডিজিটাল ভুবন হয় - তাহলে ডিজিটাল কাহারে কয়? প্রশ্নটা অবান্তর নিশ্চয় নয়। এইতো নেই-নেই করেও হাজার সমস্যাজাল ভেদ করেই বাংলা অক্ষরলিপি অনায়াসলব্ধতায় লিখছি ! একি অনেক বড় পাওয়া নয়? আমরা যে কালে অক্ষরলিপি শিশুপাঠে মায়ের হাত ধরেই শিখেছিলাম তখন কেউ ভাবতে পারতাম এমন করে এমন অনায়াসলব্ধ পাওয়া যায় দুনিয়া? এক ক্লিকেই এমন ভুবন প্রাপ্তি? এই যে এই লেখায় চটজলদি আমার মোবাইলে ধারণকৃত আমার জানলাদৃশ্য সংযুক্ত করতে পারা -  এর চে' বড় পাওয়া আপাততঃ আমার নেই। এবঙ নেই বলেই এই মুহূর্তে মৃত্যু যদি বা ডাক পাঠায় বিন্দুমাত্র হবোনা দুঃখিত। দুঃখহীন চলে যাবার জন্য আমার আর কোনও প্রস্তুতির প্রয়োজনই নেই। কথাটা লেখামাত্র ক্যামন আনন্দিতচিত্তে হাড়পাঁজরা ভেসে যায়-যায় প্রায় ! তখনইতো কিছু পঙক্তি এলো - এবঙ আসামাত্র তারেই নিলাম হৃদয়ে গেঁথে। সে হলো জীবনপুঁথি আমার। 

   এক। 
আহ জীবনপুঁথি।। 
সে হীরেমোতি।। 
আহা জীবনপুরের জীবনপুঁথি শোনেন ভাই ও বোন - 
এক জনমের জীবনলিপি করি যে বর্ণন - সে অনির্বচন।।  
তার দুঃখ অতল।। 
আহা সুখ টলোমল।। 
তার দুঃখচেরা মুক্তিকালের শ্রুতলিপিভাঁজে - 
তুমুল সবুজ এদেশেরই ইতিহাস বাজে - 
তার রক্তলিপি।। 
তার ইচ্ছে লিখি।। 
তাহার ইচ্ছেলিপি উড়েপুড়ে নদী-নীলাকাশে - 
ভেসে-ভেসে জয়োচ্ছ্বাসে মেঘেমেঘে হাসে - 
তার মনোভাষা।। 
তাহার শতেক ব্যাথা স্মৃতিলতা শত ঝরাপাতা - রক্তজলে ভাসা।। 
রক্তজলের ভাষা স্নেহমাখা ব্যাথারঙে আঁকা - 
যেন রক্তজবা।।  
যেন জনমনের মুক্তিসনদ বড়ো সনাতন - 
বড়ো মুক্তচরণ।। 
আহা জনপদে জনযোদ্ধার সারিসারি মুখ - 
অই মুখেতে মুক্তিকালের শ্রেষ্ঠতম সুখ।। 
সন্ত জীবনমরণ - 
সন্ত জীবনমরণ ছুঁয়ে-ছুঁয়ে মৃতসঞ্জীবন - সে শ্রেষ্ঠ জীবন।। 
সেই জীবনসূত্রে পাওয়া লক্ষ জীবন সাধারণ - 
তার ধূলিচরণ।। 
তার রোজের পুরাণ রোজের দহন মনোসঞ্চালন - 
তারে বলি সৃজন।। 
বলি কেন করো শতচ্ছিন্ন ছিলাম অভিন্ন - 
জীবনেরই হৃদয়জ শিকড় অননন্য - 
সে মহাসৃজন।। 
সে যে রক্তজলের রক্তলিপি হৃদিগুঞ্জন - 
আহা করি বর্ণন।। 
সে মহাগুঞ্জন।। 
সে জীবনবোধন।। 

দুই। 
আজও জীবনীয়া কালাকালের মহাগুঞ্জনাদি - 
শুনেশুনে জানলাতলে ছায়া জ্বেলে কাঁদি।। 
কান্না কি আর অন্যজীবন তবু জীবনবাজি - 
দেশেদেশে মহাজীবন বাঁধা জীবনপাখি।। 
দেখি তুমুল রঙবেরঙের ছটফটানো ডানা - 
ডানার ভাঁজে জীবনপুরের অগ্নিসংযোজনা।। 
জ্বলেপুড়ে নদনদীরও এপারওপার কানা।। 
কে কার আপন কে বা অপর কেউতো জানিনা।। 
কে কবে কোন ভরদুপুরে সন্ধেবাতির সুরে - 
ডেকেছিলো খুঁজেছিলো মনোহরপুরে।। 
আজও জোয়ারভাটার বঙ্গদেশে পাগলা হাওয়ার ঢেউ - 
ঢেউয়ের গন্ধে দেশবিদেশি রাজারাজরা ফেউ।। 
তাদের লোভী চোখ - 
চোখলবাজের নজর লেগে পোড়ে বাংলা চোখ।। 
তাহার অধিক পোড়ে মাঠে বাংলা মায়ের মন - 
মনোজিয়া ঘাসে-ঘাসে ধূলি সন্তরণ।। 
ধূলিকাদায় ঝলোমলো পদ্মপাতায় জল - 
মায়ের স্বপ্ন ছলছল।। 
স্বপ্নে পাওয়া সোনার দেশের চন্দুসূর্যতলে - 
জীবনপুরের জীবনগুলি নেভে আর জ্বলে।। 
জ্বলে বৃক্ষ বনভূমি হাওড়বাওড় হিয়া  - 
চিরকালের মনপবনের নায়ে উড়াল দিয়া।। 
শুনি একূল-ওকূল দুইকূলচেরা মাঝিমাল্লার গান - 
ছলছলাইয়া ওঠে কাঙাল এক জনমের প্রাণ।। 
আর যত প্রাণঘাতি সব হৃত উচাটন - 
তারই তরে জনম-জনম ধন্য বৃন্দাবন।। 
আহারবিহার ছাড়া তারা ছটফটাইয়া ধায় - 
জীবনমরণ চষেও সে তাহারে না পায়।। 
আহা হাছন আহা লালন কালিদাসের কাল - 
কালাকালের গর্ভে তারা চিরকালের লাল।। 
চরণতলে জীবনপুঁথি তাদেরই তরে - 
মরণসাগরপারের ঢেউ ধন্য-ধন্য করে।। 
চরণতলে জীবনপুঁথি তাদেরই তরে - 
মরণসাগরপারের ঢেউ ধন্য-ধন্য করে।। 

   ~ নুরুন্নাহার শিরীন ঢাকা বাংলাদেশ।। 
   (*দুইখানা কাব্যই পুঁথিস্টাইলে পাঠ্য*) 
           ১৪২১ বঙ্গাব্দ।।
    

  

1 টি মন্তব্য:

  1. স্বপ্নে পাওয়া সোনার দেশের চন্দুসূর্যতলে -
    "জীবনপুরের জীবনগুলি নেভে আর জ্বলে।।
    জ্বলে বৃক্ষ বনভূমি হাওড়বাওড় হিয়া -
    চিরকালের মনপবনের নায়ে উড়াল দিয়া।।
    শুনি একূল-ওকূল দুইকূলচেরা মাঝিমাল্লার গান -
    ছলছলাইয়া ওঠে কাঙাল এক জনমের প্রাণ।। "

    সত্যি অনুভূতিকে প্রচন্ড নাড়া দিয়ে গেল । আধুনিক ও আধুনিকোত্তর কালের পাদপীঠে হঠাৎ আমার বোধের ভেতর নিদ্রিত মধ্যযুগ হলহলাইয়া উঠল । এ যেন একটি বিস্মৃত যুগের দিকে নতুন করে ফিরে দেখা, যেখানে আলাওল, দৌলত কাজী, চন্ডিদাস এর মত কবিগণ দাপটে বিচরণ করেছিলেন । আমি অবিভুত । শিরীন আপা সালাম এবং ভাল থাকবেন ।

    উত্তরমুছুন